মহীন রীয়াদ/ বাঙলা কবিতা এবং দৃষ্টান্তবাদ (প্রথম পর্ব) : অস্পৃশ্য-অদৃশ্য অতীন্দ্রিয় উপাদান

কবিতা প্রলাপ নয়, যদিও প্রলাপ আর কবিতা অভিন্ন অনেকের কাছে। এটি অস্পষ্ট-অন্ধকার কিছু নয়, কেউ-কেউ ZvB—`vwe করেন, বলেন : এটি রাহস্যিক-ঐন্দ্রজালিক। কবিতা সবসময় দীপ্তিময়, এর ধ্রুব কোনো সংজ্ঞা এখানে হাজির করছি না; কারণ, সংজ্ঞায়িত করা মানে গণ্ডিবদ্ধ করা। কবিতাকে সর্বঊর্ধ্বে ভাবি। যুগক্রমে অনেকেই এর সংজ্ঞা দিয়েছেন। যেগুলোর কিছু সম্ভাব্যভাবে যৌক্তিক আবার অনেকগুলো পড়ে সংজ্ঞাকারীকে প্রকাণ্ড গর্দভ মনে হয়েছে। কবিতা এমন, যা অনায়াসে অনেকেই মৌলিক-অর্থে বুঝে ওঠেন না; অর্থাৎ এতে কবির অভিপ্রায় পূর্ণঅর্থে বোঝা দূরহ, আপাতদৃষ্টিতে। KweZv—†gav-gb-gb‡bi, শৈল্পিক-ভাষিক উৎসারণ। উৎকৃষ্টতম শব্দের প্রকৃষ্টতম বিন্যাস ব’লে, একটি কবিতার উপজীব্য বিষয়, মূল ধারণা, গূঢ় A_©— তিন-চতুর্থাংশ আবিষ্কার করা একজন বিচক্ষণের পক্ষে সম্ভব, বাকিটা প্রায় ক্ষানিকটা অস্ফুষ্ট থেকে যেতে পারে। মানে এ-নয়, এটি রহস্যময়; এর অস্পষ্ট-অংশও উদ্‌ঘাটনযোগ্য। একটি কবিতার, প্রথম পাঠে যে বোধ পাই, পরবর্তিতে ভিন্ন বোধের উদ্ধার ঘটে; অর্থাৎ, এর ¯^i~c অনির্দিষ্ট। আবার, একেকজন একই সাথে একই কবিতায় একেক বোধ/ব্যাখ্যা পায়। একটি কবিতা একার্থবহ নয় সবার কাছে; কারণ, কবিতা থাকে পাঠকের বোধে/মনে। কিন্তু ‘রহস্যময়’ বিষয় উদ্ভাবনের সম্ভাবনা ক্ষীণ, বেশিভাগের কাছেই তা একার্থক। কবিতায় অব্যাখ্যাত ইঙ্গিত থাকায় হয়তো এমনটা। ব্যাখ্যা গদ্যের দাবি, এখানেই কবিতার সাথে এর তফাৎ। সংজ্ঞার ভিন্নতাকে পুঁজি করে কবিতাকে রহস্যময় বানানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই; আবার, সংজ্ঞায়িত করার বাধ্যবাধকতাও দেখছি না। ঢেউ (অষ্টম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪১৬/মে ২০০৯)-এ সবুজ তাপস’র মাধ্যমে ‘দৃষ্টান্তবাদ’ (দৃষ্‌টান্‌তোবাদ : DRISHTANTOISM) দৃষ্টিগ্রাহ্য হলো। কাগজটিতে, এ-বিষয়ে আছে একটি পর্ব/অধ্যায়; আরেকটি পর্বের আটআনা অংশ মহীন রীয়াদ সম্পাদিত শঙ্খবাস (প্রথম বর্ষ। প্রথম সংখ্যা; শ্রাবণ ১৪১৬/অগাস্ট ২০০৯)-এ রয়েছে। এ-বিষয়ে তিনি এ-পর্যন্ত প্রারম্ভিক ধারণা দিয়েছেন, দৃষ্টান্তবাদী কবিতার স্বরূপ স্পষ্ট করতে চেষ্টা করেছেন। G-M‡`¨— দৃষ্টান্তবাদী (Drishtantoistic) দৃষ্টিকোণ †_‡K— বাঙলা কবিতা, অস্পৃশ্য-অদৃশ্য অতীন্দ্রিয় উপাদানের ব্যবহারে এবং রহস্যীকরণপ্রবণতার আধিক্যের গুণে কীভাবে হারিয়েছে ¯^”QZv, হয়েছে শিল্পশূন্য, অসার এবং উদাহরণ হ’য়ে উঠেছে অপকবিতা (অনেকের বোধে হয়তো KweZv)— তার ব্যাখ্যা হাজির করতে চেষ্টা করবো। অজস্র কবিতা লেখার এ-দেশে কবিতা লেখার ব্যর্থ চেষ্টা করছি, দণ্ডিত হচ্ছি, অপরাধ করছি প্রতিনিয়ত, কাতর হচ্ছি অপরাধবোধে। বাঙলা কবিতার এমন-অবস্থা, যাদের কবিতা না লিখে মাছ চাষ করা শ্রেয় ছিলো তারাও কবিতা রচতে এসেছেন। কেউ-কেউ ভাবছেন তাদের কোন গুণ না থাকলেও আছে কবিতা লেখার (আধ্যাত্মিক) গুণ; আমি ভাবি, কবিতা সৃষ্টি করতে cviv— গুণ নয়, বোধ-মনন। এখানে, সক্রিয় কবিতাকর্মিসংখ্যা সহস্রাধিক অথচ বিশুদ্ধ কবি হাতেগোনা। ব্যাপারটা মৎসডিম্ব cÖK…wZ— যেনো, একশজন থেকে নিরানব্বইজন ঝরে না গেলে একজন প্রকৃত কবি তৈরি হ’য়ে ওঠে না, একজন কবির জন্যে প্রয়োজন পড়ছে সহস্রাধিক কবিতাকর্মির। বাঙলা কবিতা পিছিয়ে পড়ার উৎকৃষ্ট কারণ এটি। দৃষ্টান্তবাদ সম্পর্কে সবুজ তাপস বলেছেন, এ-দর্শন “অস্পৃশ্য-অদৃশ্য বিষয়ের নয়, বাস্তব বিষয়ের অবতারণা করে মুন্সিয়ানা দেখানোর পক্ষপাতী।[1]” এবং ঈশ্বর’র মতোন অস্পৃশ্য-অদৃশ্য অতীন্দ্রিয় সত্তা সম্পর্কে, “‘ঈশ্বর আছেন’ এবং ‘ঈশ্বর নেই’— এ-দুই প্রত্যয়ের কোন্‌টি বাস্তব সত্য তা চিরকালই অনির্দিষ্ট থাকবে; শুধু এই নিয়ে পরধর্মচর্চায় কেউ-কেউ আস্তিক হবে, কেউ-কেউ নাস্তিক। দৃষ্টান্তবাদ আস্তিক্যবাদী নয়, আবার নাস্তিক্যবাদী দর্শনও নয়।[1]” এ-দুটো বক্তব্য সামনে রেখেই মূলত আমার অভিযাত্রা। বাঙলা কবিতায় বিশাল-অংশে ঢুকে গেছে বিশ্বাস (Belief); যা অবাস্তব, সন্দেহাত্মক, অনুমানলব্ধ। “অনুমান (Inference) প্রমাণ নয়”, অনুমানাশ্রিত শব্দও তাই যথার্থ (Source of knowledge) হ’তে পারে না। যা সন্দিগ্ধ, অদৃশ্যমান-দৃষ্টান্তহীন তা বিশ্বাস করতে হয়, জিইয়ে রাখতে হয়; যা অসন্দিগ্ধ, প্রামাণ্য তার পক্ষে বিশ্বাসের প্রশ্ন অবান্তর, তা বাস্তব [যা ইন্দ্রিয় মারফতে যৌক্তিকভাবে অনুধাব্য, প্রত্যক্ষ (Perceptible)| কিন্তু, ইন্দ্রিয়ের অনুধাবনের ওপরই সবকিছু সীমাবদ্ধ? —Avwg যেহেতু, অলৌকিকতা ও প্রথাগত অন্ধবিশ্বাসরহিত বিজ্ঞানের উৎকর্ষ মানি তাই আমার কাছে যা কিছুর অস্তিত্ব যৌক্তিকভাবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তা বাস্তব (Real/Material)| ভবিষ্যতে অই উৎকর্ষের ফল (যুক্তিযুক্ত-প্রমাণিত) যা দাঁড়াবে, আমলে নেব।]। আমার কাছে এখনো কেউ জানতে চান নি, ‘গরু’ বিশ্বাস করি কিনা, জানতে চেয়েছেন ‘ভূত’ কিংবা ‘ঈশ্বর’ অথবা ‘ঈশ্বরে’ বিশ্বাস করি কিনা। গরু, বিশ্বাস্য বিষয় নয়, দৃশ্যমান-দৃষ্টান্তযুক্ত, ¯^-Aw¯—Z¡ প্রকাশে অন্যের প্রয়োজন দাবি করে না। গরু নিয়ে রচনা লেখা যেতে পারে তবে এ-নিয়ে ধর্মীয় কিতাব ছাপানো অযৌক্তিক। গরু দৃষ্টান্তবাদ-সমর্থিত। (যিনি বা) যা কিছু দৃষ্টান্তশূন্য-অস্তিত্বশূন্য তা দৃষ্টান্তবাদ-এ অপ্রাসঙ্গিক[1] (Irrelevant)| উপরে, ‘ঈশ্বর’র দৃষ্টান্তবাদী ব্যাখ্যা তাপস যা দিয়েছেন, তাতে একে (ঈশ্বরকে) দৃষ্টান্তবাদ-এ অপ্রাসঙ্গিক[1] বলছি। বাঙলা ভাষায় ‘বিশ্বাস’ e¨vL¨vZ—AwbðqZv অর্থে; অথচ, কতিপয় কু-মতলবিরা ¯^mv‡_© সম্পূর্ণ উল্টো ব্যাখ্যা প্রচার করে প্রতারিত করছেন অনেককেই। ব্যাপারটা গাধার সামনে মূলো ধরার মতো। বাঙলা কবিতায় কবিরা (নিরানব্বই ভাগ কবিয়াল) নিজ পরিবার থেকে অবভাসিত প্রথাগত বিশ্বাস, অপধ্যানধারণা ঢুকিয়েছেন এবং ঢুকোচ্ছেন ‘যেমন খুশি তেমন লেখ’ পদ্ধতিতে। তা কতোটা যুক্তি-ভিত্তিহীন AcÖ‡qvRbxq— পরখ করেন নি, হয়তো তারা অক্ষম ছিলেন। এরা মৌলিকত্বশূন্য শোচনীয়রূপে, এদের মূল হাতিয়ার যুক্তিরহিত আবেগ (Illogical Emotions)| এ সস্তা আবেগ ফেলে দিলে বাঙলা কবিতার হাজারবছরের মহাপ্রাচীর ভেঙে পড়বে। বিশ্বাসাশ্রিত কাব্যকাঠামো শক্তিশালী হ’তে পারে না, ওগুলো ভ্রমপূর্ণ; এ-জাতীয় বিশ্বাসাবেগাক্রান্ত কবিতা দৃষ্টান্তবাদী দৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয় এবং দুষ্ট, প্রকৃষ্ট শিল্পকলার উদাহরণ হ’তে পারে না। এখানকার অধিকাংশ পাঠক কবিতায় শিল্পকলা উপভোগের নামে ভোগ করেন প্রথাগত নষ্ট-আবেগ। কবিদের সামপ্র্রদায়িক মানসিকতার ফলেই এ-দশা। অসামপ্রদায়িক মানসিকতা যতোদিন তৈরি না হবে, ততোদিন বাঙলা কবিতা অন্ধকারে ভ’রে থাকবে। `„óvš—ev`—wek¦vm নয়, দৃষ্টান্তের ওপর নির্মিত কাব্যদর্শন (Poetry based philosophy/PBP)| এ-মতে : কবিতায় যতোটুকু বিশ্বাস, অস্পৃশ্য-অদৃশ্য অতীন্দ্রিয় উপাদান, যুক্তিরহিত আবেগ এবং অপ-পঙ্‌ক্তি/ভাব/বোধ/উদ্দেশ্যর .. মিশ্রণ, ততোটুকু অপকবিতাত্ব1। এ-অপকবিতাংশের জন্যে বাকিটুকু দৃষ্টান্তবাদ-সমর্থিত হওয়া সত্ত্বেও সর্বাঙ্গীনভাবে অপকবিতার উদাহরণ হ’য়ে দাঁড়ায়। ‘সবক’টি গাছ গ’লে গেছে মোমবাতির মতো।’ পঙ্‌ক্তিটি দৃষ্টান্তবাদ সমর্থন করে, এতে বিশ্বসিত কিছু নেই। এখানে ‘গাছ’ এবং ‘মোমবাতি’ নাম (Noun) এবং “গ’লে যাওয়া” ক্রিয়া (Verb) wPΗ`„k¨gvb (Visible), এবং পঙ্‌ক্তিটির সম্ভাবনা (Probability) বিদ্যমান। ব্যবহৃত শব্দগুলো দৃষ্টান্তযুক্ত, ত্বগিন্দ্রিয়গ্রাহ্য-অনুভবযোগ্য। কবির ঐন্দ্রিয়ক কল্পনায় MvQ—†gvgevwZi মতো গ’লে যেতে পারে, যেহেতু কল্পনা (Imagination) সীমাবদ্ধ নয়। ‘গাছ’ এবং ‘†gvgevwZ’— এ-দুটো দৃশ্যমান বস্তুকে আরেকটি দৃশ্যমান ক্রিয়া “গ’লে যাওয়া”-এর সংস্পর্শে এনে কবি এ-যৌক্তিক পঙ্‌ক্তিটি (Logical Verse/LV) কল্পনা করতেই পারেন। অর্থাৎ এখানে, দৃশ্যমান বস্তুর সংস্পর্শে যৌক্তিক দৃশ্যমান পরিস্থিতি (Logical Visible Situation/LVS) সৃষ্টি হয়েছে। যা কিছু বাস্তব-দৃশ্যমান-অনুধাব্য-প্রমাণিত তা যৌক্তিকার্থপূর্ণ এবং এ-জাতীয় শব্দসহযোগে নির্মিত তাৎপর্যপূর্ণ পঙ্‌ক্তি/বাক্য দৃষ্টান্তবাদ-সমর্থিত2। “বাবা ছিলেন অনেকটা আল্লা­র মতো, তার জ্যোতি দেখলে আমরা সেজদা দিতাম” পঙ্‌ক্তিটি দুষ্ট। “আমাদের মা” (কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু ; ১৯৯৮) কবিতায় হুমায়ুন আজাদ, বাবা’র সাথে (মা-সন্তানদের) একধরনের দূরহসম্পর্কাচরণ তৈরিতে ‘আল্লা’ শব্দটি বসিয়েছেন। এটি কেনো ভ্রমপূর্ণ (দৃষ্টান্তবাদী দৃষ্টিতে), আগেই লিখেছি। এ-ধরনের অতীন্দ্রিয় সত্তার অতি প্রয়োগ লক্ষ করি তার পেরোনোর কিছু নেই (২০০৪) কাব্যে। পঙ্‌ক্তিটি ¯^we‡ivwaZvc~Y© (প্রথাগত) এবং দৃষ্টান্তবাদ-অসমর্থিত। “কাব্যশক্তি মহাশক্তি, বিধাতার দান, নরলোকে তিনি ধন্য, যিনি তাহা পান। … কাব্য ব্রক্ষ্মা, কাব্য বিষ্ণু, কাব্য মহেশ্বর; কাব্য আল্লাহ, রসুলুল্লাহ, কাব্যই ঈশ্বর।” (নির্মলেন্দু গুণ। কাব্যকথা। পথে পথে পাথর ; ২০০৭) গুণ’র ধারণা কাব্য এমন এক শক্তি যা অবান্তর বিধাতার কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন, পেয়ে ধন্য হয়েছেন আর কাব্যকে মিলিয়েছেন ব্রক্ষ্মা-বিষ্ণু-আল্লাহ-ঈশ্বর এর মতো অস্তিত্বহীন (‘অদৃশ্য’ অর্থে) বিষয়ের সাথে। তার অনেক কবিতা হিন্দু সামপ্রদায়িক মানসিকতা আশ্রিত। গুণ’র প্রধান গুণই এটা; আরেকটা হলো তোষামোদ করা। এসব কবিতা দৃষ্টান্তবাদ-অসমর্থিত, বিভিন্ন অর্থহীন শব্দের কারণেই। এ-হচ্ছে আমাদের বর্তমান (অত্যাধুনিক) কবিদের ¯^i~c| তারা এখনো চেতনে-অচেতনে আলৌকিকতা, ভ্রমসঙ্কুলতা, সামপ্রদায়িকতা লালন করছেন। এ-জন্যেই হয়তো, সৈয়দ শামসুল হক-কেও ‘আত্মা’র মতো আযৌক্তিক-অবান্তর ধারণা নিয়ে কবিতা করতে হয়েছে। এ-করে তারা কবিতাকে মুক্তি দিচ্ছেন কতোটুকু? “কতো দূরে বেড়াতে গেলুম, আর একটু দূরেই ছিলো ¯^M©” সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, “¯^‡M©i কাছে” (দাঁড়াও সুন্দর ; ১৩৮২ বাঙলা)-কবিতায় অনেক দূরে বেড়াতে বেড়াতে ¯^‡M©i কাছাকাছি গিয়ে ¯^M©-wgbvi দেখে এসেছেন, সময়সল্পতার জন্যে ¯^M©v‡ivnb করতে পারেন নি! তিনিই বোধ হয় প্রথম জানালেন, ¯^‡M© যাওয়া যায় রেলপথে; অর্থাৎ, অইটি মর্ত্যে (বলছি bv— ওটিকে শূন্যেই হ’তে হবে, ¯^M©-biK ওসব অবান্তর ধারণা, কুমতলবিদের বানানো; বলতে চেয়েছি প্রচারিত ধারণার কথা।), যেখান থেকে ঘ্রাণ পেয়েছেন পারিজাতের। তবে এখানে, Aevš—i-¯^M©`„k¨Kí বাদ দিয়ে ভ্রান্তি তৈরি না করলেও পারতেন। কবিতায় এইসবের ব্যাবহারাধিক্যে বোধ হয়, তার ঈশ্বর/ঈশ্বরে বিশ্বাস না থাকলেও বিশ্বাস থেকে গেছে প্রথাগত কতিপয় অতীন্দ্রিয় ধারণায়। নিজেকে অবিশ্বাসী দাবি করলেও তিনি, আমার ধারণা, অলৌকিকতা-পারলৌকিকতা ছাড়িয়ে যেতে পারেন wb— “প্রতিটি ট্রেনের সঙ্গে আমার চতুর্থভাগ আত্মা ছুটে যায় প্রতিটি আত্মার সঙ্গে আমার নিজস্ব ট্রেন অসময় নিয়ে খেলা করে।” (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। আত্মা। বন্দী জেগে আছো ; ১৩৭৫) তার আত্মা ট্রেনের সাথে ছুটোছুটি করে, খেলা করে। এ-সুনীল’র বিশ্বাসাবিশ্বাস, ¯^we‡ivax প্রকারের। আত্মাবাদী হয়ে ঈশ্বর’র অস্তিত্বে সংশয় প্রকাশ করে তিনি কী বুঝাচ্ছেন? দৃষ্টান্তবাদ, AvZ¥vev`x-mskqev`x—†Kv‡bvwUB নয়। এ-দর্শন আত্মার নয় মনের অস্তিত্বে আস্থাশীল দর্শন[৩]। “প্রভু, শোনো, এই অধমকে যদি ধরাধামে পাঠালেই, তবে কেন হায় করলে না তুমি তোতাপাখি আমাকেই ?” (শামসুর রাহমান। প্রভুকে। বিদ্ধস্ত নীলিমা ; ১৯৬৫) ‘নিজস্ব কথা বলবার গুরুভার’ থেকে মুক্তি লাভের আকাঙক্ষায় রাহমান, এ-আশ্বাদিপ্রেরণপঙ্‌ক্তি লিখেছেন ‘প্রভু’ নামক অস্পৃশ্য-অদৃশ্য সত্তার Kv‡Q— কেনো তাকে তোতাপাখি করে ধরাধামে পাঠানো হয় নি? যেনো তাকে ধরাধামে কোনো অলৌকিকতা থেকে পাঠানো হয়েছে, অবদান অই কাল্পনিক সত্তার, তবে প্রভু তাকে তোতাপাখি (কথা বলতে অক্ষম) করে পাঠালে কথা বলার গুঢ়দায়িত্বাভার থেকে বেঁচে যেতেন। তিনি হয়তো এ-ব্যাপারে ভীতসন্ত্রস্ত। প্রথম পঙ্‌ক্তিটি ভ্রমাত্মক, ফলে কবিতাটিও। তিনি এখানে, প্রথাগত বিশ্বাস রচেছেন। বিশ্বাস একসময় গ’লে যায়, নষ্ট হয় মাংসের মতো। অবিশ্বাস (Unbelief) চিত্ররূপময়, ভেঙে পড়ে না, নশ্বর। বিশ্বাসগ্রস্ত কবিতা, কবিতা নয়। দৃষ্টান্তবাদী KweZv— শব্দ (Word) বাক্য (Sentence) পঙ্‌ক্তি (Verse) দৃশ্য/চিত্রকল্প (Visible Object) ভাব (Condition) কল্পনা (Imagination) উদ্দেশ্য (Goal) ..-এর যৌক্তিকরূপ[২]। যৌক্তিকতা তোয়াক্কা না করে বিশ্বাসের আশ্রয়ে বাঙলা সাহিত্যে যে-কবিতা তৈরি হয়েছে/হচ্ছে/হবে, তা দৃষ্টান্তবাদী স্কেলে গ্রহণযোগ্য নয়। কালের পর কাল এখানকার কবিরা বিশ্বাসাশ্রয়ী কবিতাই চর্চা করেছেন। বাঙলা কবিতায় বিশ্বাসবিকিরণের কাজ করেছেন A‡b‡K— বাল্মীকী, বড়ু চন্ডীদাস, শাহ মুহম্মদ সগীর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, গোলাম মোস্তফা, কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ (..)। বেশি করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি কবিতাকে সবচেয়ে বেশি ধোঁয়াটে-ঐন্দ্রজালিক K‡i‡Qb— এ-করে ক্ষতি করেছেন অনেকখানি। দৃষ্টান্তবাদী দৃষ্টিতে, ইতোপূর্বের অনেক শক্তিসম্পদশালী কবি কবিতাকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি ক্ষতি সাধনও করেছেন। রবীন্দ্রনাথ, বাঙলা কবিতাঙ্গন যেমন করছেন ঋদ্ধ, তেমনি করেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন। তার অসামান্য কবিতার পাশাপাশি সামান্য কবিতাও আছে। লিখেছেন, অযৌক্তিক অদৃশ্য অপভাববহনকারি পঙ্‌ক্তি (Illogical Invisible Badconditioned Verse/IIBV), এর ফলে হাতিয়েছেন নোবেল। তবে, অধিকাংশ কবিতায় অবাস্তব দৃশ্যকল্পের প্রাচুর্য থাকলেও তার নোবেল সনদ-মেডেল দৃশ্যমান-বাস্তব, দৃষ্টান্তবাদ-সমর্থিত; অপকবিতাগুলো নয়। কাজী নজরুল ইসলাম, বাঙলা ভাষার প্রধান বিভ্রান্ত কুসংস্কারদীপ্ত লেখক, প্রথাগত চিত্রকল্পাশ্রয়ে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে পঙ্‌ক্তির পর পঙ্‌ক্তি কম লিখেন নি। অনেকটা জঙ্গি মানসিকতা নিয়ে কবিতাকে কর্কশ-বারুদময় করে জর্দারকোটা বানিয়ে পথে-ঘাটে-মাঠে নামানোর কাজ করেছেন তিনি (তার কবিতা স্লোগানধর্মী; অইরকম না হলেই ভালো। এটি মিছিলের অস্ত্র নয়, ধর্মীয় পুথিও নয়। কবিতার বিষয় হ’তে পারে me—gvbwQ, তবে ‘সব’ নিয়ে ‘কবিতা’ করার কী দরকার?)। সুকান্তও কম করেন নি। নজরুল হলেন মুসলমানদের রবীন্দ্রনাথ, বাঙালি-মুসলমানের ওপর চেপে আছেন বোঝার মতো। wj‡L‡Qb— # “আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়/ আমার নবী মোহাম্মদ, যাঁহার তারিফ জগৎময়।” # “নামাজ পড়, রোজা রাখো, কলমা পড় ভাই।/ তোর আখেরের কাজ করে নে, সময় যে আর নাই” # “মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই,/ যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই” এখানে নজরুল বিদ্রোহী নন, একজন ইসলামান্ধ। আরও wj‡L‡Qb— # “কালী কালী মন্ত্র জপি বসে লোকের ঘোর শ্মশানে” # “তোর রাঙা পায়ে নে মা শ্যামা আমার প্রথম পূজার ফুল” # “বল্‌ রে জবা বল্‌!/ কোন্‌ সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণতল” এখানে তিনি ইসলামান্ধ নন, কালীভক্ত। আমি বিভ্রান্ত হই : একইসাথে একজন ইসলামান্ধ হয়ে হামদ-নাত রচেন, আবার কীভাবে কালী-কালী মন্ত্র জপেন! লোকের ধারণা : তিনি দু’টোর মিলন ঘটিয়েছেন; তিনি সাম্যবাদী? অই গানগুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো তখন, অর্থ এনে দিয়েছিলো; এ-জন্যেই হয়তো সচেতন ছিলেন না তিনি, নষ্ট করেছেন প্রতিভা, হ’য়ে উঠেছেন পুঁথিসাহিত্যিক। প্রতিক্রিয়াশীল বিশেষ এক সমপ্রদায়/ধর্মীয়গোষ্ঠীও তাকে নষ্ট করেছে অনেক। কী বিশ্বাসী/অনুসারী ছিলেন তিনি, বোঝা যায় না। পঙ্‌ক্তিগুলো হয়তো অসচেতনতা, মূর্খতারই dmj— তিনি বিশুদ্ধ মননশীল ছিলেন না, তাই লিখতে †c‡i‡Qb— “নারী নাহি হতে চায় শুধু একা কারো,/ এরা দেবী, এরা লোভী, যত পূজা পায় এরা চায় তত আরো।/ ইহাদের অতিলোভী মন/ একজনে তৃপ্ত নয়, এক পেয়ে সুখী নয়,/ যাচে বহু জন।” (কাজী নজরুল ইসলাম। পূজারিণী। দোলন-চাঁপা ; ১৯২৩) পঙ্‌ক্তিগুলো পুরুষতন্ত্রের পক্ষপাতি, নারীদের বিপক্ষপাতি। হয়তো বাহ্যিক সদিচ্ছাসত্ত্বেও, তিনি ছিলেন পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি। তিনি নারীদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ হাস্যকর ধারণা লালন করতেন, বোঝা যাচ্ছে। সমস্ত নারীদের, ভয়ংকর দানবী রূপে দেখিয়েছেন যেনো এরা হিংস্র কোনো ক্ষুধার্ত প্রাণী। অথচ, নিজেই কবিতার পাশাপাশি দূষিত করেছেন বাঙলার বিভিন্নাঞ্চলের নারীদের। সম্পূর্ণ অপঅর্থবহনকৃত অবিশুদ্ধ পঙ্‌ক্তিগুলোর উদ্দেশ্য ভিত্তিহীন, সস্তা আবেগের প্রায়াস। প্রকৃত মননশীল কবি কখনো এইধরনের পঙ্‌ক্তি রচনায় প্রলুব্ধ হন না। অপশিক্ষা এবং ধর্মীয়-প্রতিক্রিয়াশীলতার কারণে, বাজেপঙ্‌ক্তি রচতে উৎসাহিত ছিলেন তিনি। কবিকে অবশ্যই হ’তে হবে শিক্ষিত-বিচক্ষণ-মননশীল; কবি মাজারের খাদেম হবেন কেনো? নজরুল, প্রকৃত শিক্ষিত ছিলেন না, ছিলেন প্রথাগত অপসাংস্কৃতিক শিক্ষায় শিক্ষিত; g~L©Zv—hvi অধিক শ্রেয়! কবিকে, প্রথম ভাষা-ব্যাকরণে শিক্ষিত হ’তে হয়, বোধ করি। তাহলে রবীন্দ্রনাথ-কে কী বলবো? নজরুল, অপশিক্ষায় শিক্ষিত হ’তে হতে, কালীকীর্তন করতে করতে, ইসলাম প্রচার করতে করতে এখন রাষ্ট্রধর্মী বাংলাদেশের জাতীয় Kwe—Bmjvwg জাতীয়তাবাদী কবি। তার মতো রবীন্দ্রনাথকেও বিশ্বকবির বদলে ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদী কবি’ বলাই শ্রেয়! যেহেতু, হিন্দু সংস্কৃতির প্রথাগত বিশ্বাস আত্মা, সত্তা, পুথিগত PwiÎvL¨vb—nvweRvwe ঢুকে গেছে (ঢুকিয়ে দিয়েছেন) তার লেখায়। তার পঙ্‌ক্তিকে ঐন্দ্রজালিক করতে পারার অসাধারণ প্রতিভা ছিলো। দৃষ্টান্তবাদী দৃষ্টিতে শুধু চিত্তাকর্ষক/হর্ষক পঙ্‌ক্তি-চিত্রকল্পের নোঙর ফেলে পাঠকচিত্ত তৃপ্ত করতে পারলেই তা কবিতা হ’য়ে ওঠে না; এইগুলোর দৃশ্যমান রূপ, কল্পনাসম্ভব অস্তিত্ব থাকতে হবে, কবিতায় উপযুক্ততা পেতে হবে, হ’তে হবে তাৎপর্যপূর্ণ—দৃষ্টান্তযুক্ত[২] । আসা যাক রবীন্দ্রনাথ’র কবিতায়। কবিতাকে বিশ্বাসযুক্ত এবং ঐন্দ্রজালিক করা তার প্রিয় বিষয় ছিলো, বোধ করি। তিনি নজরুল’র মতো স্থূলভাবে কিছু প্রকাশ করেন নি। তার ছিলো প্রবল রহস্যীকরণপ্রবণতা, যার মাধ্যমে মিথ্যেকেও আকর্ষণীয় শক্তিশালী শ্রুতিমধুর করে তুলতে পারতেন। তিনি রহস্যীকরণের এক প্রধান ঐন্দ্রজালিক। ‘‘প্রথম দিনের সূর্য প্রশ্ন করেছিল সত্তার নূতন Avwef©v‡e— কে তুমি ? মেলে নি উত্তর। বৎসর বৎসর চলে গেল, দিবসের শেষ সূর্য শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল পশ্চিমসাগরতীরে, নিস্তব্ধ mܨvq— কে তুমি ? পেল না উত্তর।” (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৩ সংখ্যক। শেষ লেখা ; ১৯৪১) কবিতাটি ঐন্দ্রজালিক, দৃষ্টান্তবাদ-অসমর্থিত। ‘‘প্রথম দিনের m~h©”—g‡b হচ্ছে, সূর্যের জন্মের ‘প্রথম দিনের’ কথা e‡j‡Qb—gv‡b, সূর্যের বয়েস তখন এক দিন! যে, জন্মেই প্রশ্ন করে নূতনাবির্ভূত এক ÔmËvÕ-†K— কে তুমি? —DËi মেলে নি। যেনো, মহাবিশ্ব তৈরি ছিলো; হঠাৎ একদিন সূর্য নামক মহান দার্শনিক জন্মে, জন্মের প্রথম দিনই, ‘সত্তা’ নামক আরেক দার্শনিককে প্রশ্ন K‡i—| তিনি এখানে, সূর্যৎপত্তিসংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক ধারণার বিপক্ষে গেছেন! লিখেছেন, ‘‘দিবসের শেষ সূর্য”। অথচ দিবসের প্রথম/শেষ সূর্য বলে কিছু নেই! ‘সত্তা’ শব্দটিও এখানে ঐন্দ্রজালিক। আমার ধারণা, এখানে ‘সত্তা’ তিনিই। হয়তো, তার পৃথিবীতে আসার প্রথম দিন, তার সূর্য তাকে প্রশ্ন (সূর্য প্রশ্ন করে?) K‡i—‘‘†K তুমি?”; শেষ দিনও একই প্রশ্ন K‡i— তিনি নিরুত্তর। মাঝে সূর্য আরো প্রশ্ন করে বলেও মনে হচ্ছে; উত্তর দেন নি সেগুলোরও। কবিতার মতো নিজেকেও করেছেন রাহস্যিক। এখানে, ‘সত্তার প্রথম দিন’ লিখলে শ্রেয় হতো; ভ্রমসৃষ্টি হতো না, সুন্দর কবিতা হ’য়ে উঠতো এটি। অধিকাংশ পাঠক রবি বাবু’র কবিতায় গভীর ‘দর্শন’ আছে ভাবেন। কবিতায় দার্শনিকতা থাকতে পারে তবে একটি কবিতাকে প্রথমে হ’য়ে উঠতে হয় মোটা দাগে কবিতা এবং ইন্দ্রিয়গুলোকে নাড়া দিতে পারার সক্ষমশিল্প। কবিতা, e¨_©Zv-mvdj¨-Kvgbv-evmbv-Avb‡›`vj­vm-hš¿Yv—bvbv যৌক্তিকাবেগ প্রকাশমাধ্যম। রবীন্দ্রনাথ’র লেখায় পাওয়া যায় প্রাচীন ভারতীয়দের দার্শনিক চিন্তার কাব্যরূপ, যেখানে নিজস্ব মৌলিক দর্শন প্রায় অনুপুস্থিত। এখানকার পাঠক তার লেখাকে ধর্মীয় কিতাবের মতো ভাবেন, তবে তিনি না লিখলে বাঙলা সাহিত্যের ক্ষতি হতো। কিন্তু তিনি বিশুদ্ধতার পাশাপাশি রচেছেন অবিশুদ্ধতা। উপরের কবিতাটি তার নির্জীব হবার আগে অপ্রকাশিত ছিলো বলে এর জন্যে তাকে শাসানো না গেলেও কিছু পঙ্‌ক্তির বেলায় তা পারা hvq— ‘‘জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ” সতীদাহের চিতার আগুনে বিমুগ্ধ হয়ে তরুণ রবি, এই অপপঙ্‌ক্তি রচেছেন, বোধ করি। এতে প্রমাণিত হয়েছে তার AweP¶YZv—hv সতীদাহের প্রতি উস্কানিমূলক। এখানে হিন্দু সংস্কৃতির মূর্খামিপূর্ণ নোংরা বিশ্বাস জাজ্বল্যমান। এটি দৃষ্টান্তবাদ-সমর্থিত হতো, কিন্তু উদ্দেশ্যের (Purpose) কারণে তা হ’য়ে ওঠে নি; অর্থাৎ এখানে প্রতিটি শব্দ দৃষ্টান্তবাদ-সমর্থিত হলেও এর উদ্দেশ্য বিশ্বসিত। তিনি গোটা গীতাঞ্জলি জুড়েও বিশ্বাস i‡P‡Qb— # ‘‘বিপদে মোরে রক্ষা করো/ এ নহে মোর প্রার্থনা,/ বিপদে আমি না যেন করি ভয়।” ৪ স্তবক # ‘‘যদি তোমার দেখা না পাই, প্রভু,/ এবার এ জীবনে” ২৪ স্তবক # ‘‘প্রভু, তোমা লাগি আঁখি জাগে;/ দেখা না পাই/ পথ চাই,” ২৮ স্তবক # ‘‘একটি নমস্কারে, প্রভু,/ একটি নমস্কারে/ সকল দেহ লুটিয়ে পড়ুক” ১৪৮ স্তবক গীতাঞ্জলি (১৯১০); মূলত আধ্যাত্মিকতা আর পরমসত্তার প্রতি সমর্পণ, যেখানে ফুটে ওঠে তার বিশ্বাস যা পেয়েছেন পরিবার নামক কারখানা থেকে এবং এগুলোকে উপনিষদের অনেক সুন্দর মিথ্যেয় অলংকৃত করেছেন। তার লেখায় পাওয়া যায় এক অতীন্দ্রিয় পরমসত্তা, যার স্পর্শ তিনি দেখতে পেতেন প্রাকৃতিক mewKQy‡Z— ‘‘সারা জীবন দিল আলো সূর্য গ্রহ চাঁদ তোমার আশীর্বাদ, হে প্রভু, তোমার আশীর্বাদ ॥” ভাববাদী রবীন্দ্রনাথ’র বিশ্বাস সূর্য গ্রহ Puv`— এগুলো অই অতীন্দ্রিয় সত্তার আশীর্বাদ; যেখানে সক্রেতিস’র wek¦vm—¯^‡M© তিনি থাকবেন দেবতাদের সংস্পর্শে সেখানে রবীন্দ্রনাথ’র লেখায়, দেবতার বিচরণ হয়তো ¯^fveZB| দৃষ্টান্তবাদী কবিতায় এ-ধরনের অপপঙ্‌ক্তির স্থান নেই; এরচেয়ে ‘‘তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে”, ‘‘আমাদের ছোটো নদী” (পদ্য) অধিক প্রাসঙ্গিক। দৃষ্টান্তবাদী কবিতা, বেদরকারি আবেগের নয়, সুনির্দিষ্ট ও প্রকৃত মননের প্রয়াসসিদ্ধ, বিশুদ্ধ শিল্পকলার পক্ষপাতী। ধর্মীয় উদ্দেশ্যে কবিতা রচেছেন— বাল্মীকী, শাহ মুহম্মদ সগীর, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ—অনেকেই। রাম-সীতা-আল্লা-খোদা জপেছেন, ছিলেন সুবিধাবাদীদের দলে। তাদের অইসব উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে দৃষ্টান্তবাদীরা নাখোশ। ‘কবিতা’র বিশেষণ ‘ধর্মীয়’ কখনোই হ’তে পারে না, অটি এক পক্ষের, গোত্র/দলের মূল্যবান বিশেষণ পর্যন্ত ঠিক আছে, বুঝাতে পেরেছি? উপরের কবিদের কবিতায়, রামায়ণ, গীতা, বেদ, কোরান, পূরাণ প্রভৃতির চরিত্রাখ্যানের ব্যবহার ব্যাপক, যা একজনকে করে তোলে আদিমগুহাবন্দী[৩]। বাল্মীকী’র লেখায় আছে, রাম-সীতা— চরিত্রগুলোর কখনোই বাস্তব অস্তিত্ব ছিলো না, আছে পৃথিবীর কিছু মানুষের প্রথাগত বিশ্বাস। তাছাড়া, চরিত্র অবাস্তব-কাল্পনিক হওয়া দুষ্ট নয়— সুনীল’র ‘নীরা’, জীবনানন্দ’র ‘বনলতা সেন’ (মতানৈক্য থাকলেও এ-চরিত্র প্রথাগত বিশ্বাসবিকিরণকারী নয়) কাল্পনিক-অদৃশ্যমান চরিত্র হওয়া সত্ত্বেও, দৃষ্টান্তবাদে আমলযোগ্য। কারণ, প্রথাগত অপসাংস্কৃতিক ভাবাদর্শ প্রচারের উদ্দেশ্য তাদের (কবির) ছিলো, বোধ করি না। কবিতায় রাম-সীতার ব্যবহার ক্ষতিকর, এতে একজন পাঠক উৎসাহিত হতেই পারেন রামায়ণ-এর প্রতি যা তাকে ঠেলে দেবে আদিমতায়, তার বোধ-চিন্তা বিকাশে বাধা দেবে। প্রচলিত ধর্ম (কিছু পরে এর দৃষ্টান্তবাদী সংজ্ঞা আছে) অনেক কিছুতেই বাধা দেয় : এখানে প্রকাশ্যে চুম্বন করা নিষেধ (দৃষ্টান্তবাদ এতে প্রাণিত করছে না!) অথচ, প্রকাশ্যে নারীকে চিতায় পোড়ানো আদেশ! আবার, প্রেম নিষিদ্ধ অথচ, পুরুষদের জন্যে বহুবিবাহ স্বীকৃত (৪.৩)! [বিয়ের পর স্ত্রি-ধর্ষণও স্বীকৃত, বলা যায়! (২.২২৩)] এইসব বিধি-নিষেধ হাস্যকর, ভয়ংকর এবং অযৌক্তিক। এসব, কতিপয় কুমতলবিদের তৈরি, প্রশ্নহীন-মূর্খামিপূর্ণ-বিশ্বাসযুক্ত, মানুষকে লোভী, ভিতু (“জবষরমরড়হ রং নধংবফ, ও ঃযরহশ, ঢ়ৎরসধৎরষু ধহফ সধরহষু ঁঢ়ড়হ ভবধৎ.” —ইবৎঃৎধহফ জঁংংবষষ) আর হিংস্র করে তোলে, কেড়ে নেয় মননশীলতা এবং স্বাধীনতা। রাসেল’র বোধ যৌক্তিক, “সব ধর্মই ক্ষতিকর এবং অসত্য”। শাহ মুহম্মদ সগীর’র ইউসুফ জোলেখা কাব্য ধর্মীয় উপাখ্যানের বর্ণনা, এর উপজীব্য বিষয়—ইসলামী পটভূমি। অই কাব্য না লিখলে বাঙলা কবিতাঙ্গন দরিদ্র থাকতো না, যদিও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ভাবে এর শিল্পমূল্য অতুলনীয়! গোলাম মোস্তফা’র কবিতায় ইসলামী ঐতিহ্যের প্রভাব পরিলক্ষিত, ধর্মীয় অনুভূতিসম্ভূত। তিনি, সর্বদাই ইসলামাদর্শের পুনর্প্রতিষ্ঠার কাজে আস্তব্যস্ত ছিলেন, মুহম্মদ’র জীবনী (বিশ্বনবী, ১৯৪২) রচনা করাকে তাই গুরদায়িত্ব ভেবেছেন। অবিশ্যি, তা নিচুমানের গবেষণার উৎপাদন। ফররুখ আহমদ’র কবিতা ইসলামী জাগরণ, মৌল ধর্মতত্ত্ব, সুফীবাদী ত্যাগ-বিনয়— এসব নিয়ে। তিনি, কবিতার মাধ্যমে ইসলাম প্রচারের কাজটাই করেছেন—নেচেনেচে (ছন্দের কথা বলছি)। তার কাম্য ছিলো কঠোর মধ্যযুগীয় ইসলামী জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, আর অই কাল্পনিক সত্তার জয়। আধুনিক না হ’তে পেরে হয়েছিলেন মধ্যযুগীয়; অথচ, অই পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের গর্দভেরা তাকে রোমান্টিক আখ্যা দেন। আমি তার মধ্যে দেখি— খালেদের তলোয়ার, তৌহিদের সেনা, মুয়াজ্জিনের আযান, জিহাদের (যুদ্ধের) প্রস্তুতি— যেগুলো অনাধুনিক। তার সাথে— আহসান হাবিব, আবুল হোসেন, গোলাম কুদ্দুস, সৈয়দ আলী আহসান— এরাও কষ্ট করে বাঙলা কবিতায় চেপে চেপে ঢুকিয়েছেন অপবিশ্বাস (বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত ; ১৯৭৯; মুহম্মদ আবদুল হাই, সৈয়দ আলী আহসান)। এদের মধ্যে সৈয়দ আলী আহসান পাতায়পাতায় রচেছেন, ‘বোগদাদী সাহিত্য’। অনাধুনিকতা ও বিশ্বাসচর্চার মূলে ছিলেন এরা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাম্প্রদায়িক অনুভূতিতে কাতর/আক্রান্ত হয়ে কবিতা লেখার কোনো প্রাসঙ্গিকতা/ যৌক্তিকতা আছে মনে করি না। দৃষ্টান্তবাদী কবি এ-ধরনের ধর্মীয় অনুভূতিতে আশেক হয়ে অপতত্ত্ব[১] (উত্তর আধুনিকতা, উত্তর-আধুনিকতা) কপচায় না, বিপক্ষেও নেই [যেমন : ‘নজরুল পদ্ধতি’, আবার আক্রান্ত সুকান্ত, ব্রিটিশদের বলেছেন, “বিদেশি কুকুর!” (“বিদেশী কুকুর! আবার এসেছে একুশে নভেম্বর।”; একুশে নভেম্বর ঃ ১৯৪৬); ব্রিটিশরা অত্যাচারী—মানি কিন্তু, একজন কবির মানুষকে ‘কুকুর’ বলার প্রবণতা থাকা অনুচিত, তার উচিৎ ছিলো পরোক্ষভাবে প্রতিবাদ করা। এছাড়া গদ্য দিয়েও তো এইসব করা যায়, কবিতার মতোন বিষয়কে অস্ত্র বানানোর কী মানে? এই করলে কবিতাকে মন থেকে হাতে-পথে নামিয়ে আনা হয় না?], কারণ এর (ধর্মের) পক্ষাচারণ করলেও পৃথিবীতে অশান্তির অন্ধকার সৃষ্টি হয়, আবার বিপক্ষাচারণ করলেও চাপাতির কোপ খেতে হয়। ধর্ম বিকৃত-বিক্রি করে যারা নষ্ট-রাজনীতি করে তারা (এরা ধর্ম ও রাজনীতি নয়, বোঝে ধর্ম-রাজনীতি) হৈচৈ করার সুযোগ পায়। একজনকে প্রচলিত দৃষ্টিকোণ থেকে অন্ধধার্মিক-আস্তিক হতে জানাশোনার, জ্ঞানের প্রয়োজন নেই, নিরর্থক বিশ্বাসই যথেষ্ট, কিন্তু নাস্তিক্য এর বিপ্রতীপ (আগেও বলেছি, দৃষ্টান্তবাদ আস্তিক্যবাদী-নাস্তিক্যবাদী দর্শন, কোনোটিই নয়[১])। দৃষ্টান্তবাদী কবিতা, প্রচলিত আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় মানসিকতা বর্জিত। এ-দর্শনে, ধর্ম (ধৃ >) : ‘বস্তুর ধারণকৃত স্বভাব, প্রকৃতি।’ অদৃশ্য বিধাতা/দৃশ্যমান মানব প্রদত্ত (যাই মনে করা হোক) পূজ্য/উপাস্য সকল তথাকথিত ধর্ম (প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা) এবং এর প্রণেতা দৃষ্টান্তবাদ-এ অপ্রাসঙ্গিক (ওৎৎবষবাধহঃ)[১]। # “উড়ায়ে মরুর বায়ে ছিন্ন বেদ-বেদান্তের পাতা/ বলেছি পিশাচহস্তে নিহত বিধাতা।” # “ভগবান, ভগবান, রিক্ত নাম তুমি কি কেবলই?” # “হে বিধাতা,/ অতিক্রান্ত শতাব্দীর পৈতৃক বিধাতা,” তিরিশের আধুনিক কবিদের অনেকেই ঈশ্বর’র অস্তিত্বে অবিশ্বাসী ছিলেন। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, উপরের অপপঙ্ক্তিগুলো রচলেও নজরুল’র মতো স্থুলতার সাহার্য নেন নি। তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ঈশ্বরকে। সমকালীন অন্যেরা তা এড়িয়ে গেলেও তিনি কবিতায় এই অস্পৃশ্য-অদৃশ্য সত্তার বিরোধিতা করে অবচেতনভাবে নিজের এবং পাঠকের মনে এর অস্তিত্ব¡ প্রতিষ্ঠাই করেছেন; পঙ্ক্তিগুলো তারই প্রয়াস। “আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে— এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয়— হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে ; হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল-ছায়ায় ; (জীবনানন্দ দাশ। আবার আসিব ফিরে। রূপসী বাংলা , ১৯৫৭) চিত্ররূপময় কবিতাটি দৃষ্টান্তবাদ-অসমর্থিত। এর প্রতিটি শব্দ-বাক্য-পঙ্ক্তি সমর্থিত, শুধু উদ্দেশ্য-মূলভাব দৃষ্টান্তবাদ অসমর্থিত। এখানে, হিন্দু সংস্কৃতির প্রথাগত বিশ্বাস্য উপাদান—পুনরুজ্জীবনের বিষয় জাজ¦ল্যমান। বাঙলার প্রতি গভীর টান অনুভবের কারণে কবি, নির্জীব হবার পরও এখানে ফিরে আসবেন বলছেন। চেতনে হোক অবচেতনে হোক, এতে ঢুকে গেছে প্রথাগত বিশ্বাস; জীবনানন্দকে অর্ধজাগ্রত বলেই মনে হয়! পুনরুজ্জীবন মেনে নেয়ার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। তা করলে বহু হাস্যকর-অযৌক্তিক বিষয়ের সাথে মোলাকাত করতে হয়। বাঙলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ (৬৫০-১২০০; মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র মতে)-এর কাব্য মূলত রূপকথা, ব্রতকথা, ছড়া, ডাক ও খনার বচন, প্রবাদ-প্রবচন—যার কাব্যিকরূপ বিকশিত প্রধান দু’টি রূপে— পদ (খন্ড/গীতিকবিতা), মঙ্গল(বিজয়)কাব্য (আখ্যান/ঘধৎৎধঃরাব)। এ-সবের বেশি ভাগ এসেছে ভারতীয় হিন্দু-আর্য সংস্কৃতির অন্ধবিশ্বাস থেকে। সর্বভারতীয় সংস্কৃতির রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবতসহ অন্যান্য পুরাণ (গধঃঃবৎ ড়ভ ঝধহংশৎরঃ, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়’র মতে) এক্ষেত্রে বিষয় হ’য়ে উঠেছে, যুগিয়েছে কাব্যাদর্শ-দর্শন। এ-সময়ের প্রধান ঐতিহ্যও সর্বভারতীয় কাব্যালঙ্কার, ধর্ম দর্শন। তবে বাঙালির নিজস্ব লৌকসংস্কৃতি, আখ্যায়িক মৌলিক বিষয়াদী (গধঃঃবৎ ড়ভ ইবহমধষ) পাওয়া যায়— মঙ্গলকাব্যের (মনসা, চণ্ডী, ধর্ম, শিব, কালি, শীতলা, রায়, ষষ্ঠী, সারদা প্রভৃতি) উপাখ্যানে এবং রাধা-কৃষ্ণ’র কাহিনীআংশে; যা দৃষ্টান্তবাদ-অসমর্থিত। বিভিন্ন অনুশাসনের একনায়কত্বÑধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতা পাই বন্দনাধর্মী কাব্যে। পাল যুগ (৭০০-১১০০)-এর সম্রাটরা ছিলেন বৌদ্ধ, এ-সময়ের কাব্য—বৌদ্ধ দেব-দেবী ও ধর্ম-সংঘের বন্দনা। সেন যুগ (১১০০-১২০০)-এর রাজারা ছিলেন হিন্দু, মূলত ‘কর্ণাট ক্ষত্রিয়’। সেন যুগের কাব্য ভ’রে গেছে—নারায়ণ, গোপীনাথ, কৃষ্ণ, শিব, উমা, লক্ষ্মী প্রভৃতি অস্পৃশ্য-অদৃশ্য হিন্দু দেব-দেবীর বন্দনায় (বাঙলা সাহিত্যের রূপরেখা ; গোপাল হালদার ; ১৯৭৪), যা ধর্মীয়বিশ্বাস বহনকারী। এ-যুগের কাব্যপ্রবণতা ছিলো— গোষ্ঠী কেন্দ্রিকতা, ধর্ম-নির্ভরতা, সমাজ আনুগত্য। আনাচেকানাচে ভ’রে আছে ধর্মীয় ভজন, ঈশ্বর আর ঈশ্বরতুল্যরাজার বন্দনাসহ এমন অনেক প্রয়োজনাতীত বিষয়; এগুলোকে বিশুদ্ধ শিল্পকলা বলা যাচ্ছে না। বাঙলা সাহিত্যের মধ্যযুগীয় (১২০১-১৮০০) কবিদের মূল অভিপ্রায় ছিলো পাঠকদের ধর্মকেন্দ্রিকরণ, বেশিভাগ ছিলেন ধর্মোন্মাদ। তারা শিল্পকলা না বুঝলেও ধর্মকলা বুঝতেন ভালো। হাস্যকর এটিই, অন্ধকার যুগের শুরুও এই মধ্য যুগের শুরু (১২০১) থেকেই। বাঙলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ “১২০১-১৩৫০” না লিখে ‘চলমান’ লেখা উচিৎ, কারণ এখনও এখানে লেখা হচ্ছে চন্ডীদাস, মধুসূদন, ফররুখ-দের অন্ধকারাচ্ছন্ন লেখার মতো লেখা। ‘সৃজনশীল সাহিত্য’ করতে অই যুগে কেউ কলম ধরেন নি, ধরেছেন সামাজিক/ধর্মীয় উদ্দেশ্য-প্রয়োজন-সুবিধা লাভের লক্ষে (বাঙলা সাহিত্যের রূপরেখা ; গোপাল হালদার ; ১৯৭৪)। লক্ষ ছিলো মানুষকে ধর্মান্ধ করা, কবিতাকে মুক্তি দেয়া নয়। মধ্য যুগ পুরোটাই ধর্মীয় উপকথা-রূপকথার বয়ান, যার আদি নিদর্শন— বড়– চন্ডীদাস’র শ্রীকৃষ্ণকীর্তন (প্রকৃত/পূর্ব নাম শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ)। সম্পাদনার পর বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ এর নাম দেন— শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। এর উপজীব্য বিষয় রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা (যেখানে, দানখণ্ডে, শ্রীকৃষ্ণ মহাদানী বেশে নিরুপায় শ্রীরাধাকে বলপূর্বক ধর্ষণ করেন), প্রধান চরিত্র : রাধা, কৃষ্ণ, বড়ায়ি; যা অস্তিত্বহীন, হিন্দু সংস্কৃতির গোড়া বিশ্বাস বহনকারী। ওখান থেকে শুরু মধ্যযুগীয় অন্ধকারের, চলছে—এটি দৃষ্টান্তবাদ-অসমর্থিত। তবে এর উপজীব্য বিষয় “রাধা-কৃষ্ণ’র প্রেমলীলা” (এখানে, শ্রীকৃষ্ণ চরিত্র দেবত্বের বড়াই করলেও সে আসলে ধূর্ত এক গ্রাম্য-লম্পট-ধর্ষক, গোটা কীর্তনে তার এ-রূপ স্পষ্ট। বৈষ্ণব পদাবলী, শ্রীকৃষ্ণবিজয় প্রভৃতির প্রধান অবলম্বনও অই অস্পৃশ্য-অদৃশ্য চরিত্র, “রাধা-কৃষ্ণ’র লীলাখেলা”) না হয়ে “মহীন-লীলা’র প্রেমলীলা” হলে সমর্থিত হতো! কারণ, এ-চরিত্র দু’টি বিশ্বসিত ভাবাদর্শের প্রয়াস নয়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত’র মেঘনাদবধকাব্য’র (১৮৬১) উপজীব্য বিষয়ও অই ‘রামায়ণ’ কাহিনী। তিনি রাম-রাম জপে লিখেছিলেন মহাকাব্য, যা দৃষ্টান্তবাদ-অসমর্থিত। ফররুখ আহমদ’র সাত সাগরের মাঝি কাব্যের উপজীব্য বিষয় ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য। মধ্যযুগীয় কবিরা আদি কবি(য়াল)দের মতো প্রথাগত নিয়মেই রচেছেন মধ্যযুগীয় কুসংস্কার, নির্মাণ করতে পারেন নি কোনো নতুনঅভিঘাত। বাঙলা কবিতায় পথ বা অভিঘাত নির্মাণ করেছেন, আমার মতে, হিন্দু কবিরা বিশেষ করে জীবনানন্দেরা। মুসলমান কবিরা পঙ্ক্তিতেপঙ্ক্তিতে লিখেছেন আরব-বেদুইন, গোলাবী সরবত, আল্লা-খোদা— পুথিসাহিত্য। আর মধুসূদন কিছু নিরীক্ষা করলেও তা কোনো প্রভাব ফেলে নি। এরা প্রকৃত অনাধুনিক ছিলেন, দৃষ্টান্তবাদ এইসব সমর্থন করে না। এগুলো না লিখলে বাঙলা কবিতার কোনো ক্ষতি হতো না, লিখেও লাভ হয় নি। বরঙ লেখার ফলে বাঙলা কবিতার নদী সরোবরে অন্ধকার ও অবিশুদ্ধতা বেড়েছে, ধ্বংস হয়েছে কবিতার যুক্তিধর্মিতা। “কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হল জানি না তা। নারঙ্গি বনে কাঁপছে সবুজ পাতা। দুয়ারে তোমার সাত সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা। তবু জাগলে না ? তবু, তুমি জাগলে না ?” (ফররুখ আহমদ। সাত সাগরের মাঝি। সাত সাগরের মাঝি ; ১৯৪৪) লাইনগুলো মনে কিছুই জাগাতে পারে নি, এর চেয়ে “আমাদের ছোটো নদী” অনেক সুন্দর। আমি ভাবি, কবিতার কাজ যৌক্তিকভাবে ইন্দ্রিয়কে অভিভূত করা; প্রকৃত কবিতা ইন্দ্রিয়গুলোয় দাগ কাটবেই, না হয় ওটি ঠিক কবিতা হবে না। এ-পঙ্ক্তিগুলো মনে কোনো দাগ কাটে নি, আমাকে এলামেলো করে নি, কাঁপিয়ে তোলে নি, আমার উপর বৃষ্টির মতো ঝরে নি, ইন্দ্রিয়গুলোকে স্বাদে-গন্ধে ভ’রে তোলে নি, বিদ্ধ করে নি। এমনকি এও, একজন পাঠক যিনি কবিতায় গূঢ়মহত্ত্ব না খুঁজে তৃপ্তি/আনন্দ খুঁজে বেড়ান, তিনি এটি পুরো পড়ে উঠতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ। এটি অপ্রয়োজনীয়, কবিতা নয় ছন্দবদ্ধ পদ্য; কবিতার প্রতিভাসমাত্র—নকল করেছে কবিতার দেহকে, ছুঁতে পারে নি অন্তরকে। এখানকার তত্তিকেরা(!) এতে মহৎ দর্শন খুঁজে পান (তাই দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়ভাবে মাধ্যমিক পর্যায়ে এটি পাঠ্য), কিন্তু আমি এখানে কোনো দর্শন খুঁজে পাই নি, পেয়েছি একজন মধ্যযুগীয় ইসলামপ্রচারককে। আধুনিক বাঙলা কবিতার কবিদের—জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী— উদ্ভব বিকাশের সময় এক অনাধুনিক জনপ্রিয় হ’য়ে ওঠেন। তিনি জসীমউদ্দীন। সম্পূর্ণ আধুনিকতার বিপ্রতীপে প্রথাগত অন্ধকারাচ্ছন্নতার দিকে হামাগুড়ি দিয়েছেন তিনি। একই সময়ে আধুনিকেরা যেখানে কবিতায় নতুনঅভিঘাত রচছেন, সেখানে তিনি উত্তরসুরী হ’য়ে উঠছেন বাঙলার আদিম কবিয়ালদের, হয়েছেন পল্লিকবি—অনানুধিক। পল্লিকে কবিতার বিষয় করলেই কেউ আনাধুনিক হয় না; অনেক পল্লিউপাদানের ব্যবহারেও আধুনিক থেকেছেন জীবনানন্দ। কারণ, জীবন বাবুর ছিলো আধুনিক সংবেদনশীলতা-মননশীলতা, উৎকৃষ্ট প্রকাশরীতি। পল্লি­কবির বিশাল বিশাল পদ্যে ঘুরপাক খেয়েছে— প্রেম-বিরহ-মৃত্যু-অলৌকিকতা-কুসংস্কার। এসবের ব্যবহারও করে তুলেছেন ভাবাবেগপূর্ণ। তার ১১৮ লাইনের বিশাল পদ্য “কবর” (রাখালী ; ১৯২৭), যেখানে পুনরাবৃত্তি ঘটেছে তার পছন্দের বিষয়Ñ মৃত্যু। বোঝা যাচ্ছে, তিনি এভাবে পুনরাবৃত্ত করে গোটা বংশের মৃত্যুর বর্ণনা দিতে পারতেন, দেন নি ভালোই করেছেন, নয়তো পাঠক পীড়িত বোধ করতো। “মজিদ হইতে আযান হাঁকিছে বড় সকরুণ সুর, মোর জীবনের রোজকেয়ামত ভাবিতেছি কত দূর। জোড়হাতে দাদু মোনাজাত কর, ‘আয় খোদা! রহমান। ভেস্ত নসিব করিও সকল মত্যু-ব্যথিত-প্রাণ।’” প্রথাগত অতীন্দ্রিয় বিষয়—রোজকেয়ামত, খোদা, ভেস্ত এইসব কোনো বাস্তবদৃশ্যহাজিরকারী শব্দচয়ন নয়, যা বিশ্বাসীদের মন করে তোলে ভীতসন্ত্রস্ত। তার শব্দচয়নপ্রক্রিয়াও অনাধুনিক। প্রচলিত শব্দ তিনি ছন্দের প্রয়োজনে বিদ্ঘুটে করে ফেলতেন। অবিশ্যি তার সময়ে কবিতাকে প্রথম হ’তে হতো ছন্দোবদ্ধ—পদ্য, পরে কবিতা; তবে তার বেশিভাগ লেখা আটকে গেছে পদ্যে, কবিতা হয় নি। শেষের দিকে ইসলামী শব্দের পাশাপাশি ব্যবহার করেন ব্যর্থতার প্রয়াস হিসেবে ইংরেজি শব্দ। এ-হলো বাঙলার বিখ্যাতদের অবস্থা। বর্তমান (অত্যাধুনিক) বাঙলা কথিত কবিতা দু’-ধরনের : দালালি এবং গালাগালি। কবিতাকর্মীরা (কথিত কবিরা) দু’ভাগে বিভক্ত। অনেকেই বুঝতে পেরেছেন কবিতা লেখার চেয়ে দালালি এবং দলাদলি করা অনেক সহজ, অর্থাৎ মেরুদণ্ডহীন হওয়া— ‘কবি হ’তেই হবে তবে দালাল হতে ভয় কী?’ কিন্তু, দালালি করে দালাল হওয়া যায়, কবিয়াল হওয়া যায়, কবি হওয়া যায় না—এটা তাদের মাথাতেই নেই। দালালি-দলাদলির সুবিধা অনেক, কষ্ট করে আর কবিতা লিখতে হয় না, কবিতার মতো কিছু একটা লিখে খানিকটা মেরুদণ্ডহীন হলেই প্রথম আলো’র ‘সাহিত্য সাময়িকী’, ‘কালি ও কলম’ প্রভৃতিতে নিয়মিত কবিতার নামে ছাপানো যায় কবিতার প্রতিভাস, হওয়া যায় ‘জাতীয় কবি/জাতিসত্তার কবি’! সাথে বন্ধুদের সম্পাদনায় ছোটোকাগজ নামধারি দুষ্ট পত্রিকাগুলো তো আছেই, যে-গুলো দর্শনগত মূল্যবোধশূন্য, বন্ধুবন্ধু খেলার মাঠ। অমর হ’তে হবে, এখানকার তথাকথিত কবিদের (রোগীদের) একটাই রোগ অই ওসসড়ৎঃধষরঃু। অধিকাংশ সাহিত্য পত্রিকা, পত্রিকার সাহিত্য পাতা খুললেই কবিতার নামে গুচ্ছগুচ্ছগুচ্ছতুচ্ছ লেখা অনেক দেখতে পাই। শিরোনামের আশেপাশে মোটা অক্ষরে কতোগুলো ব্যক্তিনাম গোচর হয়, যাদের অধিকাংশ অই ওসসড়ৎঃধষরঃু ফরবংরং-এ আক্রান্ত। এরা জনপরিচিত, তবে এদের লেখা মোটেই জনপ্রিয় নয়। এখানকার পাঠক খোঁজেন জননন্দিত/ নিন্দিত ‘কবি’ (অর্থাৎ, মডেল)। জনপ্রিয় হওয়ার সূত্র এ-নয়, একজন কবিতাকর্মির লেখা শুক্রবারে প্রথম আলো’র ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে ছাপা হওয়া (অবিশ্যি, অই দৈনিকগুলোর পঁচাআঙ্গুরসদৃশ কাগজে লেখা ছাপিয়ে অনেকে নিজেকে বিরাট কবি ভাবতে শুরু করেন।), ফেব্রুআরিতে গাঁটের টাকায় বই বের করা। একথা ঠিক, “সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি”, না-হলে বন্দে আলী মিয়া-ও বড় কবি। তিনিও জনপ্রিয়, তার কথিত কবিতা বছরবছর পড়ানো হচ্ছে ছেলেমেয়েদের, অথচ এগুলো মোটামুটি নিুমানের। একজন বিচক্ষণ ইচ্ছে করলেই এরচেয়ে ভালো লিখতে পারবেন, বোধ করি। আমি, দৃষ্টান্তবাদ চর্চার উপযুক্ততা খুঁজে পাই এজন্যে যে, কবির চেয়ে কবিতার অমরতাই যুক্তিযুক্ত; অবিশুদ্ধ-অপ্রকৃত কবিতা কখনো সর্বকালীন হয় না। দূষিত অমরতার চেয়ে বিশুদ্ধ মৃত্যু—শ্রেয়। বাঙলা কবিতার বিশুদ্ধ অমরতা কাম্য তবে, এর জন্যে বাঙলা কবিতাকে হ’য়ে উঠতে হবে বিশুদ্ধ, নিখুঁত। অসচেতনতা আর দুষ্টানুভূতিতে অক্রান্ত অপকবিতা (অকবিতা) লেখার পরই হারিয়ে যায়। এগুলো, কখনোই সর্বকালীন হয় না, কিছুই হয় না, লেখা না হলেও বাঙলা সাহিত্যের বিশেষ ক্ষতি হবে না। বরঙ লেখার কারণেই ক্ষতি হচ্ছে; দূষিত হচ্ছে বাঙলা কবিতাঙ্গন, পিছিয়ে পড়ছে বিশ্বসাহিত্যাঙ্গন থেকে। এ জাতীয় লেখা বাঁচিয়ে রাখে কতিপয় অন্ধ ও বাধ্যগত পাঠক আর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। যেখানে কবিতার মতো বিষয় ব্যবহৃত হয় শিক্ষার্থীদের মন ভ’রে তুলতে—ন্যায়-অন্যায়, আদেশ-উপদেশ, ধর্মানুভূতি, কুসংস্কার, নীতিকথা, পরিবর্তনশীল-রাজনৈতিকতা হাবিজাবি দ্বারা। কবিতার অপার সৌন্দর্যের সাথে পরিচিত করিয়ে শিক্ষার্থীদের বাঙলা কবিতার প্রতি আকৃষ্ট করা এদের উদ্দেশ্যে কেনোকালেই ছিলো না। এরা সুবিধাপন্থি, দলানুগত, চাটুকার—। তাই এদের পাঠ্যপুস্তক নামে কুৎসিত-দুর্গন্ধময় বইগুলোর কবিতা/পদ্য অংশ আরম্ভ হয় প্রার্থনা/মোনাজাত—ধরনের পদ্য দিয়ে। কবিতার নামে বেশিভাগ লেখাই ধর্মীয় (তাও আবার ইসলামকেন্দ্রিক, শিক্ষার্থীরা কি সবাই মুসলিম?) ও রাজনৈতিক নষ্টানুভূতিসম্ভূত। এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অপকবিতা এবং পদ্যের ছড়াছড়ি। এরা কবিতা আর পদ্যের পার্থক্যও বোঝেন না; ছেলেমেয়েদের কবিতাবিমুখী করার কাজটাই করেছেন এতোদিন। দৃষ্টান্তবাদী কবিতা বিশুদ্ধ-গূঢ় শিল্পকলা হ’য়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে, হ’য়ে উঠতে পারে বাঙলা কবিতার মৌলিক অভিঘাত স্রষ্টা। এ-কাব্যদর্শন সুদূরপ্রসারী শিল্পকলার পক্ষপাতি, কবিতাকে অন্ধকার নয় আলোর পথে পরিচালিত করার মাধ্যমে মানুষকে সৃজনশীল যুক্তি প্রয়াসে উদ্বুদ্ধকারী। [১] দৃষ্টান্তবাদী দৃষ্টিতে কবিতার সৌন্দর্যোপভোগযাত্রা—প্রথম পর্ব : অনাকাক্সিক্ষত নতুন সমস্যা। সবুজ তাপস। ঢেউ; অষ্টম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪১৬/মে ২০০৯ (সম্পাদক : সবুজ তাপস)। [২] দৃষ্টান্তবাদী দৃষ্টিতে কবিতার সৌন্দর্যোপভোগযাত্রা—দ্বিতীয় পর্ব : সৌন্দর্য, শব্দ, ছন্দ …। সবুজ তাপস। শঙ্খবাস; প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, শ্রাবণ ১৪১৬/অগাস্ট ২০০৯ (সম্পাদক : মহীন রীয়াদ)। [৩] দৃষ্টান্তবাদী দৃষ্টিতে কবিতার সৌন্দর্যোপভোগযাত্রা—দ্বিতীয় পর্ব : …পঙ্ক্তি, সুন্দর পঙ্ক্তি, কবিতার অবস্থান ও কাজ। সবুজ তাপস। শঙ্খবাস; দ্বিতীয় বর্ষ। দ্বিতীয় সংখ্যা, শ্রাবণ ১৪১৭/অগাস্ট ২০১০ (সম্পাদক : মহীন রীয়াদ)। দ্র.: নিুরেখাঙ্কিত বাক্য পরবর্তিতে গদ্যটি গ্রন্থভুক্তির পূর্বে অগ্রাহ্য বিবেচিত হ’তে পারে। ভাদ্র ১৪১৭ : সেপ্টেম্বার ২০১০ শঙ্খবাস। দ্বিতীয় বর্ষ। দ্বিতীয় সংখ্যা। শ্রাবণ ১৪১৭ (সম্পাদক : মহীন রীয়াদ)

  1. No trackbacks yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: